Friday, September 29, 2017

অপারেশন সার্চলাইট কী

অপারেশন সার্চলাইট কী?
১৯৭০সালে পাকিস্তানের জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হলেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষনা অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে না দিয়ে কূট কৌশল অনুসরণ করেন। ফলে বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসন থেকে ক্রমশ স্বাধীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এরুপ পরিস্থিতি সামরিক আন্দোলনের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালী দমনের খেলায় মেতে ওঠেন। যার ফলশ্রুতিতে সরকার গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে 1971 সালের 25 মার্চ বাঙালির হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে। অপারেশন সার্চলাইট নামক নীল নকশায় বলি হয় হাজার হাজার নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালি। অপারেশন সার্চলাইটঃ বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন কায়েম করার জন্য পাকিস্তান সেনারা 1971 সালের 25 মার্চ পাকিস্তান সামরিক সরকারের নির্দেশে যে ঘৃণ্য বর্বর নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করেছিল সেই সামরিক অভিযান কে অপারেশন সার্চলাইট বলে।
বিস্তারিত আলোচনাঃ 1971 সালের 25 মার্চ এর অপারেশন সংঘটিত হলেও মূলত মার্চের প্রথম থেকে এর প্রস্তুতি চলতে থাকে। একদিকে 16 মার্চ থেকে সহযোগিতার বৈঠক শুরু হয় অন্যদিকে জেনারেল টিক্কা খান মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন এবং রাও ফরমান আলী অপারেশন সার্চলাইট চূড়ান্ত করেন। 19 মার্চ থেকে পূর্ব বাংলার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করা হয়। এ কয়দিনে জয়দেবপুর বাঙালী সেনাদের নিরস্ত করতে গেলে সংঘর্ষ বাধে। ৭মার্চ অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ জারি হয় এবং জেনারেল হামিদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যান্টনমেন্ট এ ঘুর ঘুর শুরু করেন। 20 মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে এম ভি সোয়াত থেকে অস্ত্র ও রসদ খালাস শুরু হয়। সব প্রস্তুতি শেষে 25 মার্চ গণহত্যার জন্য বেছে নেয়া হয় মেজর জেনারেল রাও ফরমান কে ঢাকা শহরের মূল দায়িত্ব দেয়া হয়। অন্যদিকে 1970 সালের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে 25 মার্চ 1971 সালের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে 25 মার্চ 1971 সালের গন পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। এর পূর্বে ইয়াহিয়া খানের শাসনতান্ত্রিক আলোচনার জন্য 5 মার্চ রাত ঢাকায় আসেন এবং 16 মার্চ থেকে 25 মার্চ আলোচনার জন্য বসেন। অর্থাৎ এক দিকে অভিযান প্রস্তুতি অপরদিকে আলোচনা দুটি একই সাথে চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আলোচনা ব্যর্থ হলে ইয়াহিয়া খান ওই দিন ঢাকা ত্যাগ করেন। কিন্তু সামরিক বাহিনীকে গোপনে নির্দেশ দিয়ে যান সামরিক অভিযান চালাতে। ফলে 25 মার্চ রাত 10 টায় শুরু হয় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ড। সাংবাদিক ম্যাস্হনি মাসকারেনহাস এ ঘটনাকে বিশ শতকের অন্যতম প্রবঞ্চনা বলে আখ্যায়িত করেন। ওইদিন পাক সেনাবাহিনীর ব্যাটেলিয়ান সৈন্য ট্যাংক,  মেশিনগান, মর্টার নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অসংখ্য নারী শিশু যুবক হত্যা করে। উদ্দেশ্য ছিল দেশের নেতা বিন্দ বুদ্ধিজীবী ছাত্র-যুবক নির্মূল করা আর বাঙালি জাতিকে ক্রীতদাসে পরিণত করার। শুধু ঢাকাতেই সে রাতে প্রায় 50 হাজার নর-নারী নিহত হয়। পাক বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল জহিরুল হক হল জগন্নাথ হল, পিলখানা  তৎকালীন ইপিআর  ব্যারাক ও রাজার বাগ পুলিশ লাইন প্রভৃতি স্থান। ওই রাতেই শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দী হওয়ার পূর্বে শেখ মুজিব সশস্ত্র প্রতিরোধ নির্দেশ জারি করে বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন। 1971 সালের সেই কালো রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকারী ধ্বংসযজ্ঞকে অপারেশন সার্চলাইট বলা হয়।
উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় 1971 সালের 25 মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র বাঙালিদের নির্বিচারে গণহত্যা বিশ্বের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় সংযোগ করে।বিশ্ববাসী দেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর তার নজির খুব কমই দেখেছে। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সরকার আলোচনা ব্যর্থ হয় বাঙালিদের দমন করার নিমিত্তে সামরিক অভিযানের নামে যে গণহত্যা চালিয়েছিল তা ঢাকা শহরকে মৃত্যুকূপে পরিণত করে। মুক্তিযুদ্ধের পারম্ভিক মহরতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যার মূলক সামরিক অভিযানের নাম অপারেশন সার্চলাইট।

Popular Posts